লোকটার পয়সা কম থাকলে বাড়িতে কোন গ্যারাজ থাকতো না। করোলা গাড়ি গ্যারাজ থেকে ধপধপে সাদা নাক বের করে থাকতো না। যদিও গাড়িটা থেমে থেমে চলে। বাড়িটা বাসযোগ্য বটে। নিজের জমির উপর ইটের বাড়ি। লাগালাগি দালান উঠলেও সামনে খানিকটা খোলা। মনোয়ারা ভিলায় একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ নুয়ে পড়েছে। ছাদের উপর গাছ। ভোরে চড়ুই এসে বসে। কিচির মিচির গান করে। আমার ধারণা দোতলার বাড়তি অংশে শহরের ধূলো ভেদ করে জ্যোৎস্নাও এসে ঢুকে পড়ে।
একতলা একটা বাড়ি..তিনি বলেছিলেন, আর বাড়ানো হলো না, সঞ্জু।
আমার বড় নামটা বাদে সঞ্জু নামে তিনি ডাকেন। যেমন মিসবাহুল ইসলাম হয়ে গেছে মিশু ভাই।
আমি এই কথাটি জানতাম না যে স্ত্রীর সাথে দুরত্ব ছাড়াছাড়ির পর্যায়ে গেছে। বিধ্বস্ত হয়েছিলেন তিনি। যেমনটা হয় দুপক্ষ। তারপর এখানে থাকেন। আছে একজন ভৃত্য। তার ছেলেকে একা সামলানো যায় না। ছেলের কথায় পরে আসছি।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, মিনার কি বাসায় আছে? 
আছে! যাও, ওর ঘরে গেলে দেখতে পাবে। হয়তো ভিডিও গেম খেলছে। পোস্টারের ঘর। খেলনার ঘর। ওই তার সংসার।
মিনারকে পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছি মহা ব্যস্ত। বড় সাইজের পোস্টারগুলো সুন্দর। ড্রু বেরিমোরের। প্রথম দিকে নায়িকা যেমন ছিপ ছিপে। সমুদ্র সৈকতে সুইমিং পোশাকে জন স্কটের সাথে ছবি। 
আরে মিশু ভাই। আপনি না এই নায়িকা চাইতেন। বাবা আর ছেলে দুজনেরই মনে হয় একই নায়িকা পছন্দ। 
মিশু ভাইকে কোন কোন সময় বাচ্চাদের মত লাগে। ড্রু ইজ প্রিটি, নো ডাউট। সোনালী চুল মেয়ে আমার পছন্দ ওরও। মিশু ভাই প্রমাণ করে দেয় এখনো তরুণের মত রোম্যান্টিক হয়ে যাওয়ার দিন ফুরোয় নি। তবে উনি দুইশত ভাগ বাস্তববাদী। রোম্যান্টিক বাস্তববাদী বলে একটা টার্ম আমি আবিষ্কার করেছি শুধু তাকে দেখে।কনফ্লিকটিই, যেমন কেউ যদি বলে স্টিলের বালিশ, তুলোর হাতুড়ি, বরফের ডেকচি। বৈপরীত্য, এবং দ্বন্দ্ব!
তিনি হতে চেয়েছিলেন রাজনীতিবিদ। শেষে হয়েছেন উকিল। রাজনীতিবিদের রোমাঞ্চ, ভাষনের মঞ্চে আর উকিলদের রোমাঞ্চ কাঠগড়ায়! এডভোকেট শুনলেই মনে হয় একটা সবুজ রেক্সিনের সেগুন টেবিলে তিনি বসে আছেন। অনেকগুলো চেয়ার আর চারপাশে কাচের শেলফ । ডাক্তারদের হাড় হাড্ডির একটা ডিকশনারী থাকে। উকিলদের পরিচয় ধারা-উপধারার পুস্তকমহলে।
××
এই মিশুভাইই একদিন বলেছিলেন তার তরুণ বয়সের কথা। সঞ্জু, তোমরা কি যে সব প্রেম করো। এগুলো কি প্রেম না ফোনের বাক্সো। প্রেম মানে সেরেনডিপিটি, প্রেম মানে চিঠি। তোমর ভাবীকে আমি ফেরিতে দেখে প্রেমে পড়ে যাই।
ওরা ঢাকা থেকে বাসে করে সিরাজগঞ্জ যাচ্ছিল। নদীর উপর লোকজন এদিক ওদিক তাকিয়ে সময় কাটাচ্ছি।...আমড়া কেনার জন্য একটা তরুণী এসে দাঁড়ালো। 
.. দৃশ্যটা শুনতে শুনতে ভাবীর অল্প বয়সের ছবি দেখছিলাম ..ফেরিতে তোলা হলো। মুক্তোর মত দাঁতে একটা নৃশংস ভাবে আমড়ার কামড় দিতেই ওপাশে নায়ক তাকে দেখে উপায় খুঁজছে। ভাঙতি নেই বড় নোটের। তখুনি নায়ক এসে হাজির। পিস্তলের মত টাকার নোট বাগিয়ে ধরলেন। ভদ্রতাও যেন ধারালো মানুষ কাটার অস্ত্র। পাশ থেকে অন্যরা নিশ্চয়ই এসে আসফোস করছেন...কিন্তু ততক্ষণে ধন্যবাদ দেয়া শেষ। পরিচয় শুরু। 
আপনি কোথায় যাবেন?
শাহজাদপুর। বিয়ে করতে যাচ্ছি। 
বিয়ে! মেয়েটা হেসে ফেলে তাকালো।
কেন? বিয়ে করা কি অবাক হবার কিছু। আমার বয়স ২৯। তিন দাগ পড়ার আগেই বিবাহ উত্তম। 
মেয়েটি তখন মজা পেয়ে বললেন, আপনাদের আল্লাহ সুখী করুক। 
মিশু ভাই তখন মেয়েটিকে আরেকটা গল্প বললেন। তার আগের দুই বিয়ে না হবার কথা। মেয়েটি বুঝে গেল এই বিয়েও হবে না।
বিবাহ করতে যাওয়া তরুণ এবং মায়ের সাথে বাড়ি ফিরে যাও এক তরুণীর কথা চলছে। রই মধ্যে তরুণ কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছে। মেয়েটির হাতে কাটা দাগ কিসের সেটাও জিজ্ঞাসার মধ্যে চলে এলো। মেয়েটি যে বাবার মৃত্যুর পর পড়াশোনা বন্ধ সেটাও জানলেন।।
মিশু ভাই তার কথা জানালেন। রাজনীতিতে তিনবছর নষ্ট করে। এখন ওকালিতিতে প্রতিষ্ঠিত হতে বছর দেড়েক সময় লাগবে। সময় কাজে লাগলো। ডাকপিয়নের ব্যস্ততার পর দুজনের বিয়ে হলো। বেশ সুখীই ছিলেন
সে এক দীর্ঘ কথা। তাদের একমাত্র শিশুটি মানসিক ভাবে অপরিণত। ছোট বেলায় বোঝা যায় নি। সবাই বলতো স্লো। যত দিন যায় স্পষ্ট হলো মিনার সবার মতো হবে না। । ভেঙে গেল সব। 
মিশু ভাই আমাকে বললেন, সঞ্জু, আমরা তো নদীই। কোন এক দার্শনিক বলেছিলেন সবই আসলে ভাঙে। কারণ ভেঙেই নতুন করে গড়ে। আমার আর গড়া হবে না। মিনারকে কি করে সামলাবো জানি না। মিনারের মেন্টাল ডেভলমেন্ট আর হবে না।
ওকে চব্বিশঘণ্টা পাহারা দিতে হয়। বাড়ি থেকে ওকালতির অধিকাংশ কাজ সামলাতে পারি। চারপাশে তালা দিয়ে রাখার পরও দু বার পালিয়েছে। একবার বেঁচেছে দুর্ঘটনা থেকে।
বলার সময় চোখ ভিজে যাওয়া সামলাতে পারলেন না। সঞ্জু, সবাই বলে এভরিথিং ইজ মিরাকেল। মিরাকেল কি হতে পারে?
ওর ব্রেনের ভিতর কিন্তু সব ঠিক। আমি স্ক্যান করা ছবি দেখেছি। সব স্বাভাবিক। শুধু সেরিবেলামের জাল মাকড়সার জালের মত বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। তার ভাবনাগুলো এজন্য কখনই বড় হবে না। 
××
কথা স্লো মোশনে থেমে যাচ্ছিল। আমি কি বলবো বুঝতে না পেরে মিশু ভাইয়ের হাতটা ধরে ফেলি।
হাত ধরে বলি, আমার মনে হয় সব ঠিক হয়ে যাবে। সত্যিই দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাচ্ছে।
আচ্ছা আপনাদের এখানে কে বাজার করে? কথা এড়াতে গিয়ে তাকে বলি।
আমি জানি মিশু ভাইই বাজার করেন। নিজে রান্না করেন। ভৃত্যের হাতের ঝোল নাকি মিনারের পছন্দ না। 
তোমার ভাবী মাঝে মাঝে আসে। সে আসলে রান্না করে দিয়ে যায় ..এ সপ্তাহ ফ্রিজ দিয়ে চলে। এ এক দোলকের মত সংসার। তুমি বুঝতে পারবে না। দুজন একই বোঝাকে এস সাথে সহ্য করতে পারে না। সন্তান যেমন বন্ধন তেমন সন্তানের অশুভত্ব তাদের বিপর্যয়েরও কারণ।
মনোয়ারার সাথে আমার কথা হয় না। ওর মত চলে যায়। 
××
মিশু ভাইয়ের ওকালিতর বাইরে বেশ কিছু বই আছে শেলফে। শীর্ষেন্দুর সব বই। কলকাতার নরেন ব্যানার্জির কবিতা। পরেশ, শহীদুল জহির। সাইদুল আরেফিন সহ অনেক বই। গঙ্গা থেকে ভোলগা বইটা আমি তার কাছ থেকে নিয়েছিলাম।
শেলফটা যদি শোকেস না হয় তবে তা দেখে লোকের মনমানসিকতা আন্দাজ করা ইজি। মিশু ভাইয়ের একটা গুণ যে তিনি শক্ত। এত কিছুর পরও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা নেই। বললেন,
তুমি বরিশাল থেকে ঢাকায় আসছো না কেন?
বদলী করতে পয়সা দিয়েছি কিন্তু লোকটা ঘুরাচ্ছে।
তোমাকে বলবো কি ভাবে টাকা ঢাললে লাভ হবে। যদিন দেশে যদাচার। বোতলের মুখ যদি তেল চায় তবে বোতলের শরীরে তেল মেখে লাভ হবে? ঐ মুখটা কি চিহ্নিত করো। পলিটিকাল লিডার হলো সেই মুখ।
পিরোজপুরে কোয়ার্টারটা খারাপ না, আমি বললাম, সমস্যা হলো আম্মা সাথে থাকে তার চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হয় বার বার। 
তোমার বাচ্চাটাকে সময় দাও।
হ্যা, দেই। নৈবৃত্তের জন্য ভাল স্কুল চাই।
ভাল স্কুল দাও। অনেক সময় দাও। 
এই প্রথম হেসে বললেন বাচ্চাদের ছোট বেলার সময়টা জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি। 
এরপর তিনি আর ব্যক্তিগত কথায় গেলেন না। বললেন তুমি কি এখনো জেলা কমিটিতে আছো? বশির এখনো ট্রেজারার?
××
রাতে ঢাকাতে মিশু ভাইয়ের এখানেই থাকলাম। দুপুরে খেলাম এক সাথে। মিনারকে ডাকা হলো। বাইশ একুশ বছরের তরুণ। কথা বলে কিন্তু যুক্তি বোঝে না। 
তার বাবাকে বললো, আব্বা আমাকে বড় একটা বাড়ি কিনে দিবা। সিনেমায় দেখায় যেই বাড়ি। 
জি দেবো। এখন খা। পটল দিয়ে ভাত মাখায়ে খা।
ছেলেটা মাখাতে পারে। ভাত প্লেট থেকে পড়ে। একটা একটা করে ভাত আবার তোলে। বকা দেয়া যাবে না। তাহল সে উঠে যাবে।
মিনারকে বলা হলো তুমি একটা প্রিন্সেস এর সাথে দেখা করতে যাবে। তোমার চোখ মুখ সুন্দর করতে হলে অনেক ভাজা খেতে হবে। সে তখন ভাজা মাছ খায়। কাঁটা বেছে দেয় তার বাবা।
আমি বাবা ও ছেলের দিকে তাকাই। একসময় বাবা তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে থাকলো।
ওর মা আসলে বেশি হৈ চৈ করে। তখন আর আমার কথা শোনে না।
একটা বড় বালক কে প্রিন্সেস এর অজুহাতে দিয়ে ডাল সব্জি সব খাওয়ানো হলো। 
মিনারের ঘরে যারা সবাই তার প্রিন্সেস।
মিশু ভাই বললো ওর প্রিন্সেসের কথা তোমাকে বলবো।
ছেলেটা যখন চলে গেল। তার নিজের রুমে টিভি সামান্য ভলিউমে দিয়ে তিনি বললেন,
সঞ্জু একটা বুদ্ধি দাও।
আমার মাথায় আর কুলায় না। মিনারকে তো দেখেছ। সুঠাম সুন্দর স্বাস্থ্যের ছেলে। ছবি দেখে যে কারো মনে হবে ব্যাটা। ওর মন বড় হচ্ছে না জানি। ওর চাহিদাগুলো কিন্তু ছোট নেই।
সে অনেক পাগলামো করে। 
মজিদুল তার দেখাশোনা করে। সে প্রায় সময়ই আমাকে বলে যে ওর একটা বিয়ে দিলে হয়।
ও কি বোঝে? আমি প্রশ্নটা মন থেকে ঝাড়লাম।
ওর বার তের বছর থেকেই ওর মা সকালে উঠে চাদর ধুতে দিতো। নকচারনাল ইমিশন। স্বপ্নদোষ যাকে বলে বাংলায় । ডাক্তার বলেছে এটা স্বাভাবিক। ও সাবকনশাস মাইন্ডে একটা নারীকে প্রত্যাশা করে। ওরও স্বপ্ন থাকে। প্রকৃতি ওকেও মেয়ের প্রেম দিয়েছে। 
আমি বললাম, হু
ইনস্টিংক্ট ব্যাপারটা এমনই।
ঞ্জু, তোমাকে একটা কথা বলি আজকে। আমি বাবা হিসেবে চাই না ও বঞ্চিত হোক।
আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম, তাহলে
তাহলে কি করবেন?
আমি চাই না ওর শরীর বঞ্চিত হোক। আমি চাইলাম ও সেই প্লেজারটা পাক।
উপায়টা উনি বললেন একটা । মজিদুলের আত্মীয়াকে মিলেছিল। অভাবী ঘরের। বয়স ত্রিশের মত। সুন্দরী। তাকে আমি টাকা দেই। সে এসে রাতে থাকে। দরজা বন্ধ করে ওকে সময় দেয়। 
তুমি যেন কাউকে বলো না। জিনিসটা কি ভুল করলাম?
আমাদের ছাত্র সংগঠনের আদর্শবান মানুষ মিশু ভাই। সে বলছে কি? আমি দেখছি একটা ছেলে সব কিছু খুলে নিচ্ছে। সব বস্ত্র উড়ে এসে পড়ছে। একটু পর ছাপানো কাগজের নোট পেয়ে একটা মেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। 
আমার প্রশ্নটা নিজের কাছে পরিস্কার হওয়া দরকার।
মেয়েটা এভাবে যা করছে সেটা কি? অর্থদাসত্ব? নাকি সমাজ সেবা?
একপাশে জীবন নামের ফ্যাক্টরি। অর্থের বদলে মিনারকে নারীদেহ ভোগের অধিকার কিনে দিচ্ছে তারই বাবা।
সেখানেই সেদিনের সমাপ্তি হয়েছিল।
আরেকদিন..প্রায় বছর খানেক পর। ঘটনা চলছে। মিশু ভাইয়ের সঙ্গে কথা হলো।
মিশু ভাই বললেন তুমি কিন্তু আমাকে ভুল বুঝো না। আমার নিজের জীবনে মনোয়ারা ছাড়া কোন মানুষ আসে নি।
আমি কখনো পতিতাবৃত্তির পক্ষে কথা বলি নি। কিন্তু কি করি। নিজের সন্তানকে বঞ্চিত করতে চাই না! তাই উপায়ন্তর দেখে এই উপায় বের করেছি।
কিন্তু..
সঞ্জু, মেয়েটাকে আমি ডাকলাম। ডেকে বোঝালাম। বললাম সে বিয়ে করতে চাইলে বিয়েও দিতে পারি। বললাম, তোমার নিজের স্বামী মানসিকভাবে অপূর্ণ, উন্মাদ। এই পরিচয় তোমার কি ভাললাগবে? 
মেয়েটা আমাকে বলেছিল, আপনি যেভাবে বললেন, বোঝালেন। আমি আপনাকে বাবা ডাকার অনুমতি চাই।